Skip to content
Misleading: কুমিল্লায় একটি কলেজ ছাড়া কোথাও দুর্যোগ হয়নি বলে শিক্ষামন্ত্রীর দাবিটি বিভ্রান্তিকর

কুমিল্লায় একটি কলেজ ছাড়া কোথাও দুর্যোগ হয়নি বলে শিক্ষামন্ত্রীর দাবিটি বিভ্রান্তিকর

১৪ জুলাই, ২০২৬3 মিনিট পড়াFactCheckerLab

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংসদে দাবি করেন, বৃষ্টি-জলাবদ্ধতায় কুমিল্লার একটি কলেজ ছাড়া কোথাও দুর্যোগ হয়নি। বাস্তবে চট্টগ্রাম বোর্ডের ৫ জেলার পরীক্ষা স্থগিত, কুমিল্লা নগরীর ব্যাপক জলাবদ্ধতা ও নোয়াখালী-কক্সবাজারের দুর্ভোগ দাবিটিকে বিভ্রান্তিকর প্রমাণ করে।

Misleading

দাবি যাচাই

কুমিল্লায় একটি কলেজ ছাড়া কোথাও কোনো দুর্যোগ হয়নি: শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

দাবি কী?

২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে যখন সমালোচনার ঝড় উঠেছে, তখন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জাতীয় সংসদে বলেন, "এ যাবত শুধু একটি কলেজ, কুমিল্লা সরকারি কলেজের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই কলেজের মাঠটা ভরে গিয়েছিল। তাছাড়া অন্যান্য জায়গায় যখনই পানি উঠেছে, সেটা তেমন বেশি নয়, গুটিকয়েক এবং সাথে সাথেই কেন্দ্র পাল্টানো হয়েছে।"

বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসি নিউজ এই বক্তব্য প্রচার করে শিরোনাম করে, ‘কুমিল্লায় একটি কলেজ ছাড়া কোথাও কোনো দুর্যোগ হয়নি’। (ডিবিসি নিউজ, সংসদের বক্তব্য প্রতিবেদন) সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই কার্ডটিই সবচেয়ে বেশি নজরে আসে। কিন্তু বক্তব্যটি বাস্তব চিত্রের সঙ্গে মেলে না।

রায়: বিভ্রান্তিকর, কেন?

শিক্ষামন্ত্রী একটি সত্য তথ্যকে (কুমিল্লার একটি কলেজের মাঠ পানিতে ডুবে যাওয়া) সামনে রেখে গোটা পরিস্থিতির ব্যাপকতা আড়াল করেছেন। বাস্তবে সেই কয়েক দিনের দুর্যোগ একটি কলেজে সীমাবদ্ধ ছিল না, ছড়িয়ে ছিল একাধিক জেলা ও একটি পুরো শিক্ষা বোর্ড জুড়ে।

১. পুরো একটি বোর্ডের পরীক্ষাই স্থগিত হয়েছিল

মন্ত্রীর এই বক্তব্যের আগেই বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন পাঁচটি জেলার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ১৬ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত স্থগিত করা হয় [][]। একটি কলেজের খেলার মাঠ নয়, একটি গোটা বোর্ডের পরীক্ষা পিছিয়ে দিতে হয়েছিল। এটি নিজেই বড় ধরনের দুর্যোগের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। অথচ মন্ত্রীর ভাষায় অন্য জায়গায় পানি ‘তেমন বেশি নয়’ ও ‘গুটিকয়েক’।

২. কুমিল্লায় ডুবেছিল একটি কলেজ নয়, প্রায় পুরো নগরী

১৩ জুলাই সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত টানা তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে কুমিল্লা নগরীর বড় অংশ পানির নিচে চলে যায়। সড়ক থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়, আর কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীরা নৌকায় চড়ে কেন্দ্রে পৌঁছান [][][]। অর্থাৎ সমস্যাটি ‘একটি কলেজের মাঠ’ নয়, একটি শহরের ব্যাপক জলাবদ্ধতা, যার মধ্যে একাধিক কেন্দ্র পড়েছিল।

৩. নোয়াখালী, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাতেও দুর্ভোগ

দুর্ভোগ কুমিল্লাতেই থেমে থাকেনি। নোয়াখালীর হাতিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় কেন্দ্রের আশপাশে পানি জমে পরীক্ষার্থীদের চলাচল ব্যাহত হয়, আটকা পড়ে বহু পরিবার []। কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোতে ৭ জুলাই থেকে প্রবল বর্ষণে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন কেন্দ্রে পানি ঢোকে []। এতগুলো জায়গার চিত্র সামনে থাকলে ‘একটি কলেজ ছাড়া কোথাও দুর্যোগ হয়নি’ কথাটি টেকে না।

তাহলে বাস্তবে কী ঘটেছিল?

ঘটনাক্রম সাজালে ছবিটি পরিষ্কার হয়।

৭ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোতে প্রবল বৃষ্টি ও বন্যা শুরু হয়। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে আলোচনা করে চট্টগ্রাম বোর্ডের পাঁচ জেলার পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় [][]

এর মধ্যেই ১৩ জুলাই কুমিল্লায় তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরী ডুবে যায়। নৌকায় চড়ে কেন্দ্রে যাওয়া পরীক্ষার্থীদের ভিডিও ভাইরাল হলে বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নজরে আসে, কেন্দ্র পরিবর্তন করা হয় এবং পরীক্ষার্থীদের বাড়তি ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয় []। একই দিনে নোয়াখালীসহ কয়েকটি জেলায়ও পরীক্ষার্থীরা পানি মাড়িয়ে কেন্দ্রে পৌঁছান []

এই পুরো চিত্রই মন্ত্রীর ‘একটি কলেজ’ বর্ণনার বিপরীত সাক্ষ্য দেয়।

মন্ত্রী আসলে কী বলতে চেয়েছিলেন?

সদয়ভাবে ধরে নেওয়া যায়, মন্ত্রী হয়তো বোঝাতে চেয়েছিলেন যে পরীক্ষা চলমান থাকা বোর্ডগুলোর মধ্যে কেন্দ্র বদলের মতো সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা ঘটেছিল শুধু কুমিল্লার ওই কলেজেই। কিন্তু সেই ব্যাখ্যা মানলেও ‘কোথাও কোনো দুর্যোগ হয়নি’ ধরনের সাধারণীকরণ ঠিক নয়। কারণ একই সময়ে চট্টগ্রাম বোর্ডের গোটা পরীক্ষাই স্থগিত ছিল, আর কুমিল্লা শহরের জলাবদ্ধতা একটিমাত্র কেন্দ্রে থেমে ছিল না।

এ ধরনের বক্তব্যের ঝুঁকি

একজন শিক্ষামন্ত্রীর মুখে দুর্যোগের ব্যাপকতা ছোট করে দেখানো ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বাস্তব ভোগান্তি খাটো করা হয়, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি দুর্বল হয়, আর জনআস্থা কমে। এই বক্তব্যের পরপরই রাজধানীর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করেন [], যা দেখায় বাস্তব চিত্র মন্ত্রীর বর্ণনার চেয়ে অনেক ভিন্ন ছিল।

উপসংহার

কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের ঘটনাটি সত্য এবং সবচেয়ে বেশি আলোচিত, এটুকু ঠিক। কিন্তু ‘একটি কলেজ ছাড়া কোথাও কোনো দুর্যোগ হয়নি’ কথাটি একটি সত্য অংশকে সামনে রেখে বৃহত্তর বাস্তবতা আড়াল করে। পাঁচ জেলার পরীক্ষা স্থগিত, কুমিল্লা নগরীর ব্যাপক জলাবদ্ধতা এবং নোয়াখালী-কক্সবাজারসহ একাধিক জেলার দুর্ভোগ মিলিয়ে মন্ত্রীর দাবিটি বিভ্রান্তিকর

তথ্যসূত্র (7)

1

কালের কণ্ঠ: ১৬ জুলাই পর্যন্ত ৫ জেলার এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত

kalerkantho.com

বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের পাঁচ জেলার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়।

2

যুগান্তর: চট্টগ্রাম ছাড়া সারা দেশে এইচএসসি পরীক্ষা চলবে

jugantor.com

চট্টগ্রাম বিভাগের বন্যা পরিস্থিতির কারণে ওই বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত রেখে বাকি বোর্ডে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।

3

রাইজিংবিডি: বৃষ্টিতে ডুবল কুমিল্লা নগরী, নৌকায় চড়ে কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা

risingbd.com

তিন ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে কুমিল্লা নগরীর বড় অংশ পানির নিচে; পরীক্ষার্থীরা নৌকায় চড়ে কেন্দ্রে যান।

4

ইত্তেফাক: জলাবদ্ধ কুমিল্লায় নৌকায় চড়ে এইচএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা

ittefaq.com.bd

কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্র তলিয়ে যাওয়ায় পরীক্ষার্থীরা নৌকায় করে কেন্দ্রে ঢোকেন; পরে কেন্দ্র বদল ও বাড়তি সময়।

5

দেশ রূপান্তর: সড়ক-হাসপাতালে পানি, নৌকায় চড়ে কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীরা

deshrupantor.com

কুমিল্লায় সড়ক ও হাসপাতাল পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়; পরীক্ষার্থীরা নৌকায় করে কেন্দ্রে পৌঁছান।

6

মানবজমিন: বৃষ্টি-দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা

mzamin.com

কুমিল্লা ছাড়াও নোয়াখালীর হাতিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতায় পরীক্ষার্থীদের চলাচল ব্যাহত হয়।

7

দেশ রূপান্তর: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা

deshrupantor.com

পরীক্ষায় ভোগান্তির প্রতিবাদে রাজধানীর বিভিন্ন কলেজের এইচএসসি শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

এই তথ্য যাচাই FactCheckerLab দ্বারা তৈরি। আমাদের পদ্ধতি পড়ুন. সংশোধন জানান.