এসএসসি ২০২৬-এ প্রশ্ন ফাঁস গুজব বলে শিক্ষামন্ত্রী মিলনের দাবিটি মিথ্যা
শিক্ষামন্ত্রী মিলনের 'প্রশ্ন ফাঁসের প্রচারণাটি স্রেফ গুজব' দাবিটি সময় টিভির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, পরীক্ষার্থীর সাক্ষ্য, ১০,৮০০ টাকার নির্দিষ্ট লেনদেন ও 'সকল বোর্ড প্রশ্ন ২০২৬' টেলিগ্রাম চ্যানেলের প্রমাণ দ্বারা মিথ্যা প্রমাণিত।
False
দাবি যাচাই
এসএসসি ২০২৬ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের প্রচারণাটি স্রেফ একটি গুজব এবং তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে — শিক্ষামন্ত্রী এ.এন.এম. এহসানুল হক মিলন
দাবি কী?
২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল শিক্ষামন্ত্রী এ. এন. এম. এহসানুল হক মিলন তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর প্রেস বিজ্ঞপ্তি শেয়ার করে দাবি করেন:
"কথিত প্রশ্ন ফাঁসের প্রচারণাটি যে স্রেফ একটি গুজব, তা ইতোমধ্যেই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এমতাবস্থায় '২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে জন্ম নেয়া তরুণদের রাজনৈতিক দল— এনসিপির পক্ষ থেকে কোনও রকম ফ্যাক্টচেক না করেই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডার বিষয়ে এ ধরনের বিবৃতি প্রদান কেবল নিন্দনীয়ই নয়, বরং নিদারুণ হতাশাজনক।"
এর আগে ২১ এপ্রিল ২০২৬ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে এক সংবাদ সম্মেলনেও মন্ত্রী একই দাবি করেন: "প্রশ্ন ফাঁসের কোনও সম্ভাবনা নেই, এ ধরনের কোনো ঘটনাও ঘটেনি। এ নিয়ে কোনো আলোচনাও হয়নি।"[১]
তবে সময় টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও অন্তত একজন পরীক্ষার্থীর প্রকাশ্য সাক্ষ্য বলছে, প্রশ্ন ফাঁস বাস্তবেই ঘটেছে।

রায়: মিথ্যা — কেন?
শিক্ষামন্ত্রীর "প্রশ্ন ফাঁসের প্রচারণাটি স্রেফ একটি গুজব" দাবিটি সরাসরি প্রত্যক্ষ প্রমাণ দ্বারা মিথ্যা প্রমাণিত হয়:
১। সময় টেলিভিশনের সরাসরি সাক্ষ্য: সময় সংবাদের রংপুর প্রতিনিধি আব্দুর রশিদ জীবনের প্রতিবেদনে এক পরীক্ষার্থী প্রকাশ্যে জানান, ২০ এপ্রিল ২০২৬ রাত ১১টা ২৪ মিনিটে দিনাজপুর বোর্ডের বাংলা প্রথম পত্রের প্রশ্ন তাঁকে টেলিগ্রামের একটি চ্যানেলে দেওয়া হয়েছিল, এবং পরদিন ২১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে তা "হুবহু কমন। একটাও এদিক ওদিক নাই।"[২]
২। নির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য আর্থিক লেনদেন: ওই পরীক্ষার্থী জানান, বাংলা দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নের জন্য তিনি বন্ধুদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে চক্রটিকে ক্যাশ-আউটের মাধ্যমে ১০,৮০০ টাকা দিয়েছেন। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেন কোনও "গুজব"-এর বৈশিষ্ট্য নয়।[২]
৩। চ্যানেলের নাম ও ব্যাপ্তি ডকুমেন্টেড: সময় টিভির স্ক্রিনশটে দেখা যায়, "সকল বোর্ড প্রশ্ন ২০২৬" নামের একটি টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রায় ৩,০০০ সদস্য (২,৯৯০) ছিলেন এবং সেখানে ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহ — প্রতিটি বোর্ডের নামে আলাদা প্রশ্নপত্র পোস্ট করা হয়েছিল।

৪। স্বাধীন রাজনৈতিক দলের তদন্তের দাবি: ২৫ এপ্রিল ২০২৬-এ জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর শিক্ষা ও গবেষণা সেল সাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, "জাতীয় গণমাধ্যম 'সময় টেলিভিশন'-এর একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা অবগত হয়েছি যে, এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬-এর প্রশ্নপত্র প্রতারক চক্রের মাধ্যমে লাগামহীনভাবে অনলাইনে ফাঁস হয়েছে।"[৩] এনসিপি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে।

সময় টিভির ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে
এনসিপির বিবৃতি ও সরকারের পক্ষ থেকে "প্রশ্ন ফাঁস হয়নি" দাবি প্রকাশিত হওয়ার পর সময় টিভি তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি সরিয়ে নেয়। বর্তমানে ভিডিওটির লিংকে ক্লিক করলে ফেসবুক বার্তা দেখায়: "This isn't available — This content can only be seen by certain people or it may have been removed."

ভিডিওটির ক্যাশড ভার্সন এখনও পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে স্পষ্টভাবে দেখা যায় সময় টিভিই (somoynews.tv, ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট) এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছিল এবং হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করেছিল #ssc2026 #questionleak #education #dinajpurboard #somoytv। ক্যাপশনে ছিল: "১০-১২ হাজারে বিক্রি হচ্ছে এসএসসির প্রশ্নপত্র!" আমরা মূল ভিডিওটি সংরক্ষণ করেছি এবং প্রতিবেদনে উল্লেখিত শিক্ষার্থীর সাক্ষ্য সরাসরি যাচাই করেছি।

সরকারের পাল্টা অবস্থান ও তার সীমাবদ্ধতা
সরকার, পুলিশ ও শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে যে যুক্তিগুলো দেওয়া হচ্ছে:
| কর্তৃপক্ষ | বক্তব্য | তারিখ |
|---|---|---|
| শিক্ষামন্ত্রী মিলন | "প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সম্ভাবনা নেই, কোনো ঘটনাও ঘটেনি"[১] | ২১ এপ্রিল ২০২৬ |
| সিটিটিসি (ডিএমপি) | প্রতারণার অভিযোগে ৪ জনকে গ্রেফতার (সাজিব, সালমান, মাহিন, মুন্না)। দাবি: "তারা যে প্রশ্ন সরবরাহ করেছিল তা মূল প্রশ্নের সঙ্গে কোনো মিল ছিল না।"[৪][৫] | ২০-২৪ এপ্রিল ২০২৬ |
| ঢাকা শিক্ষা বোর্ড | ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, পরীক্ষার্থীদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান।[৬] | ২৫ এপ্রিল ২০২৬ |
তবে এই বক্তব্যগুলো সময় টিভিতে প্রকাশিত শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট সাক্ষ্য — অর্থাৎ ২০ এপ্রিল রাত ১১:২৪ মিনিটে দিনাজপুর বোর্ডের বাংলা প্রথম পত্রের যে প্রশ্ন বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছিল তা পরদিনের পরীক্ষার সঙ্গে হুবহু মিলে যাওয়ার দাবি — এর সরাসরি কোনো খণ্ডন করেনি। সিটিটিসি যে চক্রটিকে গ্রেফতার করেছে তা একটি "ভুয়া পেজ"-এর প্রতারক চক্র; কিন্তু এর মানে এই নয় যে অন্য চ্যানেল ("সকল বোর্ড প্রশ্ন ২০২৬") থেকে যে প্রশ্ন বিতরণ হয়েছে — যা সময় টিভি ডকুমেন্ট করেছে — সেগুলোও জাল ছিল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ক্ষমতা গ্রহণ করে। একই সঙ্গে সময় টিভি কর্তৃক একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তাদের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর অস্বীকার — এই দুই ঘটনাচক্র সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করেছে।
উপসংহার
এসএসসি ২০২৬ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার বিষয়ে প্রকাশ্য, যাচাইযোগ্য সাংবাদিকতা-প্রমাণ — সময় টেলিভিশনের প্রতিবেদন, পরীক্ষার্থীর সাক্ষ্য, নির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য, টেলিগ্রাম চ্যানেলের স্ক্রিনশট, এবং এনসিপির স্বাধীন প্রতিক্রিয়া — সবই এই দাবিকে সমর্থন করে যে প্রশ্ন ফাঁস বাস্তবেই ঘটেছে। শিক্ষামন্ত্রী এ.এন.এম. এহসানুল হক মিলনের "প্রশ্ন ফাঁসের প্রচারণাটি স্রেফ একটি গুজব" — এ দাবিটি তাই মিথ্যা।
সরকার এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিত করার পরিবর্তে একে "গুজব" বলে উড়িয়ে দিচ্ছে — যা শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
তথ্যসূত্র
[১] Bangladesh Pratidin — "No question leak, SSC exams held smoothly: Education Minister" (২১ এপ্রিল ২০২৬) [২] Somoy TV — "১০-১২ হাজারে বিক্রি হচ্ছে এসএসসির প্রশ্নপত্র!" (প্রতিবেদন: আব্দুর রশিদ জীবন, রংপুর) [৩] Times of Bangladesh — "SSC question leak: NCP voices concern, demands probe" (২৫ এপ্রিল ২০২৬) [৪] The Daily Star — "Fake SSC question paper leak racket busted; four arrested" (২৫ এপ্রিল ২০২৬) [৫] Dhaka Tribune — "CTTC: Four arrested over fake SSC question paper" (২৫ এপ্রিল ২০২৬) [৬] BSS — "Dhaka Education Board dismisses SSC question leak rumours" (২৫ এপ্রিল ২০২৬)
তথ্যসূত্র (6)
No question leak, SSC exams held smoothly: Education Minister
en.bd-pratidin.com
Education Minister A N M Ehsanul Hoque Milon said there was no possibility of question paper leaks in the SSC exams.
১০-১২ হাজারে বিক্রি হচ্ছে এসএসসির প্রশ্নপত্র! | SSC Question Leak | Telegram | Somoy TV
youtube.com
সময় টিভির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: টেলিগ্রামে সকল বোর্ড প্রশ্ন ২০২৬ গ্রুপ থেকে এসএসসি প্রশ্নপত্র বিক্রি। প্রতিবেদক: আব্দুর রশিদ জীবন, রংপুর।
SSC question leak: NCP voices concern, demands probe
tob.news
The National Citizen Party (NCP) demanded a thorough investigation into the SSC 2026 question paper leaks reported by Somoy Television.
Fake SSC question paper leak racket busted; four arrested
thedailystar.net
CTTC arrested four people for online fraud connected to alleged SSC 2026 question paper leaks.
CTTC: Four arrested over fake SSC question paper scam
dhakatribune.com
Counter Terrorism unit arrested four men for online fraud through a fake SSC 2026 question paper Facebook page.
Dhaka Education Board dismisses SSC question leak rumours
bssnews.net
The Dhaka Education Board urged students and guardians not to panic over question paper leak rumours.
এই তথ্য যাচাই FactCheckerLab দ্বারা তৈরি। আমাদের পদ্ধতি পড়ুন. সংশোধন জানান.
