"বাঙলা নববর্ষের বর্ষপঞ্জি তৈরি করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান" বলে করা প্রধানমন্ত্রীর দাবিটি মিথ্যা
প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলা নববর্ষের বর্ষপঞ্জি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ বলছে এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রায় ৪৫০ বছরের পুরনো — মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ সালে এটি প্রবর্তন করেন এবং ১৯৬৩-৬৬ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কমিটি এটি সংস্কার করে। সংস্কৃত বর্ষপঞ্জি সরকারিভাবে গৃহীত হয় ১৯৮৭ সালে — জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ৬ বছর পরে।
False
দাবি যাচাই
বাঙলা নববর্ষের বর্ষপঞ্জি তৈরি করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান
দাবি কী?
১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বাংলা নববর্ষের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দাবি করেন যে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলা নববর্ষের বর্ষপঞ্জি তৈরি করেছিলেন। দাবিটি আরটিভির সংবাদে সম্প্রচারিত হয়, যেখানে স্ক্রিনে লেখা ছিল: "বাঙলা নববর্ষের বর্ষপঞ্জি তৈরি করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানঃ প্রধানমন্ত্রী"।
রায়: মিথ্যা — কেন?
প্রধানমন্ত্রীর এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী:
১. বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রায় ৪৫০ বছরের পুরনো — জিয়াউর রহমানের জন্মেরও বহু আগে তৈরি:
বাংলা বর্ষপঞ্জি বা বঙ্গাব্দ ১৫৮৪ সালে মুঘল সম্রাট আকবর প্রবর্তন করেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ আমীর ফতেহউল্লাহ শিরাজীকে দায়িত্ব দেন একটি নতুন পঞ্জিকা তৈরি করতে, যা কৃষিভিত্তিক রাজস্ব আদায়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে [১]। হিজরি চান্দ্র পঞ্জিকা অনুসারে রাজস্ব আদায় করা হতো, কিন্তু ফসল কাটা হতো সৌর পঞ্জিকা অনুসারে — এই অসামঞ্জস্য দূর করতেই বাংলা বর্ষপঞ্জির জন্ম [১][৪]।
এমনকি কিছু ঐতিহাসিকের মতে, বাংলা বর্ষপঞ্জির মূল আরও প্রাচীন — সপ্তম শতকের গৌড় রাজা শশাঙ্কের সময়কালে এর উৎপত্তি [৪]।
২. আধুনিক সংস্কার করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কমিটি — ১৯৬৩-১৯৬৬ সালে:
বাংলা বর্ষপঞ্জিকে আরও বিজ্ঞানসম্মত করতে ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে [১][২][৫]। কমিটি ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬ সালে চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করে [৫]।
কমিটির প্রধান সংস্কারগুলো ছিল:
- বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত ৫ মাস ৩১ দিনে গণনা
- আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৭ মাস ৩০ দিনে গণনা
- প্রতি চতুর্থ বছরে অধিবর্ষে চৈত্র মাস ৩১ দিন
- সূর্যোদয়ের পরিবর্তে রাত ১২টা থেকে দিন গণনা শুরু [২][৫][৭]
এই কমিটিতে ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম, পণ্ডিত তারাপদ ভট্টাচার্য, সৈয়দ আলী আহসান-সহ বিশিষ্ট পণ্ডিত ও জ্যোতির্বিদগণ [২]।
৩. সরকারিভাবে গৃহীত হয় ১৯৮৭ সালে — জিয়ার মৃত্যুর ৬ বছর পরে:
শহীদুল্লাহ কমিটির সুপারিশকৃত সংস্কৃত বর্ষপঞ্জি সরকারিভাবে গ্রহণ করা হয় ১ জানুয়ারি ১৯৮৭ সালে [৩]। সেই সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ — জিয়াউর রহমান নন। জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সামরিক বিদ্রোহে নিহত হন — বর্ষপঞ্জি সরকারিভাবে গৃহীত হওয়ার পুরো ৬ বছর আগে।
৪. এমনকি বিএনপির নিজস্ব নথিতেও এই দাবি নেই:
বিএনপির দলীয় ওয়েবসাইটে জিয়াউর রহমানের অবদানের যে তালিকা রয়েছে, সেখানে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সার্ক গঠনের উদ্যোগ, গ্রাম সরকার ব্যবস্থা, নারী মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি উল্লেখ আছে — কিন্তু বাংলা বর্ষপঞ্জি তৈরির কোনো উল্লেখ নেই [৬]। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বিএসএস, ব্রিটানিকা-সহ কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে জিয়াউর রহমানের সাথে বাংলা বর্ষপঞ্জির কোনো সংযোগ পাওয়া যায়নি [৬]।
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ
বাংলা বর্ষপঞ্জির টাইমলাইন
| সাল | ঘটনা | কে করেছেন |
|---|---|---|
| ৫৯৪ খ্রি. | বাংলা সনের সম্ভাব্য প্রাচীন উৎপত্তি | রাজা শশাঙ্ক (গৌড়) |
| ১৫৫৬ | আকবরের সিংহাসনে আরোহণ — বঙ্গাব্দের গণনা শুরু | মুঘল সম্রাট আকবর |
| ১৫৮৪ | তারিখ-ই-ইলাহি / বাংলা বর্ষপঞ্জি আনুষ্ঠানিক প্রবর্তন | আমীর ফতেহউল্লাহ শিরাজী (আকবরের নির্দেশে) |
| ১৯৬৩ | বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি গঠন | ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ / বাংলা একাডেমি |
| ১৯৬৬ | কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ (১৭ ফেব্রুয়ারি) | শহীদুল্লাহ কমিটি |
| ১৯৭৭-৮১ | জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতিত্বকাল | বর্ষপঞ্জি-সংক্রান্ত কোনো পদক্ষেপ নেই |
| ১৯৮১ | জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড (৩০ মে) | — |
| ১৯৮৭ | সংস্কৃত বর্ষপঞ্জি সরকারিভাবে গৃহীত (১ জানুয়ারি) | এরশাদ সরকার |
| ১৯৯৫ | আরেক দফা সংস্কারের জন্য টাস্কফোর্স গঠন | বাংলা একাডেমি |
| ২০১৯ | সর্বশেষ সংশোধন — জাতীয় দিবসগুলো পশ্চিমা তারিখের সাথে মেলানো | বাংলাদেশ সরকার |
জিয়াউর রহমানের স্বীকৃত অবদান (যা বর্ষপঞ্জি নয়)
জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে — কিন্তু বাংলা বর্ষপঞ্জি তার মধ্যে নেই:
- স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ (২৭ মার্চ ১৯৭১, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র)
- বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা
- সার্ক গঠনের উদ্যোগ
- গ্রাম সরকার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
- নারী মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা (১৯৭৭)
- জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী আসন (১৯৭৯)
উপসংহার
বাংলা বর্ষপঞ্জি একটি প্রাচীন ঐতিহ্য যার শিকড় প্রায় ৪৫০ থেকে ১,৫০০ বছরের পুরনো। এটি তৈরি করেননি জিয়াউর রহমান, সংস্কারও করেননি তিনি, এমনকি সরকারিভাবে গ্রহণের সময়ও তিনি জীবিত ছিলেন না। প্রধানমন্ত্রীর এই দাবি ইতিহাস বিকৃতি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রকৃত কৃতিত্ব মুঘল সম্রাট আকবর ও তাঁর জ্যোতির্বিদ ফতেহউল্লাহ শিরাজীর, এবং আধুনিক সংস্কারের কৃতিত্ব ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও তাঁর কমিটির।
তথ্যসূত্র
[১] Bangabda — Banglapedia [২] আরেক দফা সংস্কার হচ্ছে বাংলা বর্ষপঞ্জি — প্রথম আলো [৩] A variance by a day — New Age [৪] The saga of Bangla calendar — The Business Standard [৫] বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার ও হিসাবের গরমিল — ঢাকা পোস্ট [৬] Ziaur Rahman: A revolutionary leader who reformed Bangladesh — TBS [৭] বাংলাদেশে বাংলা ক্যালেন্ডার সংস্কার — শিক্ষক বাতায়ন
তথ্যসূত্র (6)
এই তথ্য যাচাই FactCheckerLab দ্বারা তৈরি। আমাদের পদ্ধতি পড়ুন. সংশোধন জানান.
