Skip to content
Misleading: "স্বাধীনতার ঘোষণা ও যুদ্ধের দায়িত্ব নিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান" বলে করা তথ্যমন্ত্রীর দাবিটি বিভ্রান্তিকর

"স্বাধীনতার ঘোষণা ও যুদ্ধের দায়িত্ব নিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান" বলে করা তথ্যমন্ত্রীর দাবিটি বিভ্রান্তিকর

BangladeshPolitics
১ এপ্রিল, ২০২৬5 মিনিট পড়াFactCheckerLab

তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে কিছু সত্য ঘটনা (কালুরঘাট বেতার সম্প্রচার) থাকলেও, জিয়াউর রহমান যে 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে' ঘোষণা পাঠ করেছিলেন তা সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক নেতৃত্ব কাঠামো বিকৃত করা হয়েছে।

Misleading

দাবি যাচাই

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন দাবি করেছেন যে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব নিয়েছেন।

দাবি কী?

২০২৬ সালের ৩১ মার্চ, মঙ্গলবার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) আয়োজিত "স্বাধীনতার ঘোষক ও রণাঙ্গনের জিয়া" শীর্ষক আলোচনা সভায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন দাবি করেন:

"রাজনৈতিক সংগ্রাম শেখ মুজিবের নেতৃত্বে হয়েছিল এ কথা সত্য। কিন্তু যুদ্ধের অনিবার্যতা যখন দেখা দিয়েছিল তখন তার নেতৃত্ব নিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।"

তিনি আরও বলেন, জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং আওয়ামী লীগের নেতারা সেসময় "কিংকর্তব্যবিমূঢ় এবং পলায়নে ব্যস্ত" ছিলেন।

দাবির উৎস: বিএসএস নিউজ · ফেসবুক ভিডিও · ইউটিউব ভিডিও

রায়: বিভ্রান্তিকর — কেন?

আংশিক সত্য

জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সন্ধ্যা ৭:৪৫ মিনিটে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন — এটি ঐতিহাসিক সত্য এবং মুক্তিযুদ্ধের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। সেই চরম বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তার সময়ে তাঁর এই সম্প্রচার সাধারণ মানুষ এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রবলভাবে উজ্জীবিত করেছিল। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার — বঙ্গবন্ধুর দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা আর স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া এক জিনিস নয়। জিয়াউর রহমান ঘোষণাটি পাঠ ও পুনর্প্রচার করেছিলেন, ঘোষণা দেননি। []

তবে দাবিটি বিভ্রান্তিকর — চারটি কারণে:

১. জিয়াউর রহমান নিজের পক্ষে নয়, "বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে" ঘোষণা পাঠ করেছিলেন

মন্ত্রীর বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি সুকৌশলে বাদ দেওয়া হয়েছে। বাংলাপিডিয়া ও ঐতিহাসিক বিভিন্ন দলিলের তথ্য অনুযায়ী, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে "বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার আরও দুটি ঘোষণা প্রচার করা হয়। এর একটি প্রচারিত হয় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম.এ হান্নান কর্তৃক এবং অন্যটি মেজর জিয়াউর রহমান কর্তৃক।" []

অর্থাৎ জিয়াউর রহমান নিজে স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি — তিনি বঙ্গবন্ধুর নামে সেটি পুনর্প্রচার করেছিলেন। মন্ত্রী সুকৌশলে এই তথ্যটি এড়িয়ে গেছেন।

২. শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেন — জিয়ার ১৮ ঘণ্টা আগে

"১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে সামরিক বাহিনীর আক্রমণের অব্যবহিত পূর্বে এবং পাকিস্তান বাহিনী কর্তৃক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের প্রাক্কালে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।" শেখ মুজিবের ঘোষণার বার্তাটি "মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পরে চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয়।" জিয়াউর রহমানের কালুরঘাট সম্প্রচার হয়েছিল এর প্রায় ১৮ ঘণ্টা পরে, ২৭ মার্চ সন্ধ্যায়। []

৩. মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক নেতৃত্ব জিয়াউর রহমানের ছিল না

মন্ত্রী দাবি করেছেন জিয়াউর রহমান "যুদ্ধের নেতৃত্ব নিয়েছিলেন" — এটি ইতিহাস বিকৃতি। মুক্তিযুদ্ধের কাঠামো ছিল:

ভূমিকাদায়িত্বপ্রাপ্ত
রাষ্ট্রপতিবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (বন্দি)
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিসৈয়দ নজরুল ইসলাম
প্রধানমন্ত্রী ও যুদ্ধ পরিচালকতাজউদ্দীন আহমদ
সামরিক সর্বাধিনায়কজেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায়ও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ নেতা — তাঁর নামেই যুদ্ধ হয়েছে, তাঁর নির্দেশেই মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়েছে, তাঁর নামেই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, সামরিক সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল ওসমানী। জিয়াউর রহমান ছিলেন অনেক সেক্টর কমান্ডারের একজন — সমগ্র যুদ্ধের একক নেতা নন। []

৪. আওয়ামী লীগ নেতারা "পলায়ন" করেননি — মুজিবনগর সরকার গঠন করেছিলেন

মন্ত্রীর বক্তব্যে বলা হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতারা "কিংকর্তব্যবিমূঢ় এবং পলায়নে ব্যস্ত" ছিলেন। এটি ইতিহাসের সুস্পষ্ট বিকৃতি।

"ঊর্ধ্বতন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যগণ নিরাপত্তার জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নেন। ৩০ মার্চের মধ্যেই তাদের অনেকে কলকাতায় সমবেত হন।" তারা সেখানে গিয়ে প্রবাসী আইন পরিষদ গঠন করে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের খসড়া প্রণয়ন করেন এবং ৯ মাস ধরে সফলভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন — মুক্তিবাহিনী গঠন, ভারতের সাথে সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়সহ। এটি কৌশলগত পদক্ষেপ (Strategic Retreat), পলায়ন নয়। []

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র — রাষ্ট্রীয় দলিল যা মন্ত্রী উপেক্ষা করেছেন

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত এবং ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে পঠিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Proclamation of Independence) বাংলাদেশের জন্মলগ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিল। এই দলিলে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: []

"...বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান... ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন... আমরা... পূর্বাহ্ণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করছি।"

অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় দলিল অনুযায়ী স্বাধীনতার ঘোষক শেখ মুজিবুর রহমান — যা মন্ত্রীর বক্তব্যে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে।

বাংলাপিডিয়া — স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পূর্ণ পাঠ (বাংলা), শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘোষক হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি
বাংলাপিডিয়া — স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পূর্ণ পাঠ (বাংলা), শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘোষক হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি

মন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণের অর্ধেক বলেছেন

মন্ত্রী দাবি করেন ১০ই এপ্রিলে তাজউদ্দীন আহমদ জিয়ার ভূমিকাকে "ধারণ করেছেন"। আংশিক সত্য — তাজউদ্দীন চট্টগ্রামের সামরিক বিদ্রোহের প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু একই ভাষণে এবং ঘোষণাপত্রে স্বাধীনতার ঘোষণার মূল আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে, জিয়াউর রহমানকে নয়। মন্ত্রী সুকৌশলে অর্ধেক তথ্য দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন উপসংহার টেনেছেন। []

সংবিধান বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন বিশ্লেষক প্ল্যাটফর্ম সংবিধান (songbidhan.org) এই দাবিটি বিশ্লেষণ করে "মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর" রায় দিয়েছে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী: শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ শেখ মুজিবের পক্ষে সেটি পুনর্প্রচার করেন, এবং মুজিবনগর সরকারের ঘোষণাপত্রে শেখ মুজিবের ঘোষণাকেই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। []

সংবিধান (songbidhan.org) — জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা সংক্রান্ত দাবি বিশ্লেষণ
সংবিধান (songbidhan.org) — জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা সংক্রান্ত দাবি বিশ্লেষণ

ঘটনার প্রকৃত সময়রেখা

তারিখ ও সময়ঘটনা
২৫ মার্চ রাতঅপারেশন সার্চলাইট শুরু
২৬ মার্চ রাত ১২:২০শেখ মুজিব ইপিআর ওয়্যারলেসে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন
২৬ মার্চ সকালশেখ মুজিব গ্রেপ্তার
২৬ মার্চ বিকেল ৪:০০জিয়াউর রহমান সেনা বিদ্রোহ করেন
২৭ মার্চ সন্ধ্যা ৭:৪৫জিয়া কালুরঘাট থেকে শেখ মুজিবের পক্ষে ঘোষণা পাঠ করেন
১০ এপ্রিল ১৯৭১স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি — শেখ মুজিবের ঘোষণাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি
১৭ এপ্রিল ১৯৭১মুজিবনগরে ঘোষণাপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ

উপসংহার

তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের বক্তব্যটি কোনো নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক পর্যালোচনা নয় — এটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান। বক্তব্যে সুকৌশলে কিছু ঐতিহাসিক সত্যকে গোপন করা হয়েছে (বঙ্গবন্ধুর প্রাথমিক ঘোষণা, "পক্ষে" কথাটি, মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্ব) এবং কিছু ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে (জিয়াউর রহমানের একক নেতৃত্ব)।

জিয়াউর রহমানের কালুরঘাট সম্প্রচার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং তাঁর সামরিক অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু তিনি স্বাধীনতার ঘোষক ছিলেন না এবং সমগ্র যুদ্ধের একক নেতাও ছিলেন না — এটি রাষ্ট্রীয় দলিল, সমসাময়িক সাক্ষ্য এবং জিয়াউর রহমানের নিজের ঘোষণার ভাষ্য দ্বারাই প্রমাণিত।

তথ্যসূত্র

তথ্যসূত্র (4)

1

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র — বাংলাপিডিয়া

bn.banglapedia.org

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পূর্ণ বাংলা পাঠ — শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘোষক হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্ব কাঠামো, কালুরঘাট সম্প্রচার বঙ্গবন্ধুর নামে

2

সংবিধান — বাংলাদেশ সংবিধান ও আইন বিশ্লেষক প্ল্যাটফর্ম

songbidhan.org

AI সংবিধান বিশ্লেষক — মন্ত্রীর দাবি 'মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর' রায় দিয়েছে, মুজিবনগর ঘোষণাপত্রের উদ্ধৃতি সহ

3

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র — বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়

molwa.portal.gov.bd

বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সরকারি কপি

4

Swadhin Bangla Betar Kendra — Banglapedia

en.banglapedia.org

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র — কালুরঘাট সম্প্রচারের বিস্তারিত ইতিহাস, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর নামে ঘোষণা পাঠ করেন

এই তথ্য যাচাই FactCheckerLab দ্বারা তৈরি। আমাদের পদ্ধতি পড়ুন. সংশোধন জানান.

Misleading: "স্বাধীনতার ঘোষণা ও যুদ্ধের দা… | FactCheckerLab | FactCheckerLab